রাষ্ট্রের মিথ্যা উৎপাদন প্রকল্প

সামান্তা শারমিন

 প্রকাশিত: ১৯:৩০, ২০ অক্টোবর ২০১৮

৫১০ বার পঠিত

 

রাষ্ট্র শব্দটা কঠিন হলেও এর কাজটা খুবই সহজ। কিন্তু আমাদের কানে রাষ্ট্র শব্দটা খটমটে শোনানোর মূল কারণ সুবিধা ও ভীতি। আর এ দুটো তৈরি করার মূল উপায় হলো মিথ্যা। রাষ্ট্র আসলে একটি ব্যবস্থাপক পক্ষ যা এই সমাজে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে (জবাবদিহিতার)। অন্যভাবে ভাবতে গেলে এও বলা যায় সমাজের আস্থাভাজন, বিশ্বাসী ও সর্বদা প্রস্তুত ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রের অংশ হবেন। তবে এতে করে তাদের ব্যক্তিক সততার উপর নির্ভরশীল হয়ে যেতে হয় বলে আমি রাষ্ট্রের পদধারিদের ভাবতে চাই চাকরিজীবী বা পেশাজীবী হিসেবে। কারো বৈজ্ঞানিক কাজ-কারবার পচ্ছন্দ হলে সে বৈজ্ঞানিক হয়। সেবা করতে চাইলে ডাক্তার হয়। ছবি আঁকতে চাইলে শিল্পী হয় এবং এরা সবাই মিলে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা পূরণ করেন। তেমনি কেউ যদি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রত্যাশার ভার সামলাতে ভালোবাসেন তাহলে তিনি হবেন সরকারি/ রাষ্ট্রীয় চাকরিজীবী।
তো বাংলাদেশে ‘ব্যবস্থাপক’ গোষ্ঠী একশ ভাগ মগের মুল্লুক কায়েম করেছে তা আর নতুন করে প্রমাণ করার কিছুই নাই। তবে এত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে থেকেও কি করে এই অবস্থা তৈরি করলো সেটা ফিরে দেখা যেতেই পারে।
যদিও পুলিশ-সেনা-নৌ- গোয়েন্দা- বিশেষ বাহিনী দেশের মানুষের কাজে লাগার কথা, উলটো এসব বাহিনীসহ সকল সরকারি সংস্থা- সংগঠন- কমিটি আদতে যে সরকার গঠনকারী দলের কাজে লাগে তা ফকফকে পরিষ্কার। তাহলে আমি যদি বলি ‘রাষ্ট্র বলে বা করে’ তার মানে সরকারি চাকরি করা প্রতিটি মানুষের কর্মকে টুল হিসেবে ব্যবহার করেই রাষ্ট্র বলে ও করে।
তাহলে আমার প্রথম স্টেট্মেন্ট হলো- রাষ্ট্র যা বলে সবই মিথ্যা।
এই বক্তব্যের স্বপক্ষে আমার যুক্তি তুলে ধরার আগে আপনাদের বলতে চাই রাষ্ট্রের মিথ্যা মোটাদাগে দুটি স্তরে বিভক্ত।
১। রাষ্ট্র তার গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়া দুই বিষয়ের ভীতি দেখিয়ে মিথ্যা বলে। ( একটি জনপ্রিয় বিতর্কঃ সমাজে “আইন- শৃঙ্খলা রক্ষাকারী” বাহিনীর দরকার আছে কি নেই বা নিয়ন্ত্রণের আবশ্যিকতা )
২। এই স্তরটিও কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। সহজাতভাবে উপরিস্তর তথা দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব, গুম, ধর্ষণ, রিজার্ভ চুরি, বিচার ইত্যাদি বিষয়ে ক্রমাগত মিথ্যা বলা হয়। সহজভাবে বলতে গেলে এই মিথ্যা অল্প ডোজে প্রতিদিন আসতে থাকে। তাই এসব ক্ষেত্রে নাগরিকদের সহ্য ক্ষমতা ইলাস্টিকের মতই বাড়ানো হয়। কিন্তু এসব বিষয়ে প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমে জনগণ যখন একতার শক্তি বুঝতে পারেন তখন মিথ্যার রেগুলার ডোজ কাজ করে না। অনেকাংশে বাড়িয়ে দিতে হয়। অন্য সময়গুলোতে আন্দাজহীন থাকলেও এসব সময়ের মিথ্যাগুলো চটপট ধরে ফেলতে পারে সবাই।
প্রথম স্তরটি এক নম্বর হবার কারণ আছে। আমাদের ভূত- বর্তমান- ভবিষ্যৎ এর সকল সমস্যার আদি রূপ এই স্তরটি। কিন্তু এ বিষয়ক আলোচনা আমাদের সুজলা- সুফলা বাংলাদেশের মানুষ এখনও স্বাচ্ছন্দ্য, প্রয়োজনীয়তা কোন বোধই করেন না তাই এই আদি মিথ্যাকে আলোচনা থেকে আপাতত বাদ দেয়া হলো।
দ্বিতীয় স্তরটি আলোচনার সুবিধা হলো,রাষ্ট্রের যাঁতাকলে পড়ে আজকাল অনেকেই বুঝে যাচ্ছেন। তাই একটি ছোট্ট সাক্ষাৎকার পর্বের মধ্য দিয়েও বোঝার চেষ্টা করেছি। এর মধ্যেও আমার কাছে তিন রকম জায়গায় মিথ্যা বলার প্রবণতা ধরা পড়েছে। এক। তথ্য দুই। ভুল তথ্য বিশ্বাস করানোর প্রচেষ্টা ও তিন। সরাসরি অস্বীকার। সব ক্ষেত্রেই এই তিন ‘সিনারিও’ মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। যেমন ধরুন বাংলাদেশের সমস্ত পরিসংখ্যানকারী প্রতিষ্ঠান বাইরের দেশকে আকৃষ্ট করার জন্য ভুল ও আংশিক তথ্য ছাপায়। সেক্ষেত্রে আমরা নির্ভর করি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংবাদপত্রের উপর। কিন্তু বাংলাদেশে যেহেতু এক বিশেষ পরিবেশ আছে যেখানে মিডিয়া হাউজ আর এনজিও চালাতে গেলে সরকারের কারো না কারো সাথে দহরম মহরমের প্রয়োজন পড়ে তাই আমরা আমাদের স্বাভাবিক ডিফেন্স থেকে সরকারের তথ্যই ব্যবহার করি এবং বারংবার বলতে থাকি ‘সরকারের তথ্য অনুযায়ীই’ পরিস্থিতি ভয়ংকর। আদতে যা ভয়ংকরের পরিধি ছাড়িয়ে গেছে। দেখা যায় সরকারের উপর নির্ভর করাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তথ্যহীন অবস্থায় থাকতে হয়, যেমন ধরুন সাঁওতালদের বাড়ীতে আগুন দেয়ার ঘটনা। ভিডিও থাকা সত্ত্বেও পুলিশ পুরো ঘটনা অস্বীকার করে। তাই স্বভাবতই ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসনের আলাপ বাদ দিয়ে আপনাকে ব্যস্ত থাকতে হয় ঘটনা প্রমাণের জন্য। এভাবে উপরে উল্লেখিত তিন প্রবণতা একত্রিত হয়ে মিথ্যার কাঠামো তৈরি করে।
ছোট সাক্ষাৎকার পর্বের সাহায্য নিয়ে পরবর্তী আলোচনায় প্রবেশ করছি। রাষ্ট্র সংখ্যার তথ্য ছাড়াও আরেক রকম তথ্য দেয় আমাদের, রাষ্ট্রের স্বরূপ নিয়ে। রাষ্ট্র বলতে চায় তার সরকারি বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান স্বাধীন। আপনি এক জায়গায় দুর্নীতির কারণে সুবিচার না পেলেও অন্য প্রতিষ্ঠানে পাবেন। পুলিশ দুর্নীতিবাজ হলেও আদালত নয়, আদালত হলেও মিডিয়া নয়, মিডিয়া হলেও প্রধানমন্ত্রী তো অবশ্যই নয়। আপনার কাজ হলো ঘুরে ঘুরে চেক করা কোথায় গেলে আপনি সুবিচার পাবেন। কোন উদাহরণ না দিয়েই আমি বলব এপরিস্থিতি বানোয়াট, মিথ্যা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা অনেক খাটনি করে এ দৃশ্য তৈরি করেছেন। রাষ্ট্র যেভাবেই থাকুক না কেন তার অন্তর্গত সকল কিছুকে জড়িয়ে রাখে। তার অস্তিত্বের জন্যই বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা ঝুঁকিপূর্ণ।
রাষ্ট্র বলে সে তার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু এ আলোচনায় একটি বিষয় অনুপস্থিত। মানুষ। রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড যেহেতু মানুষ চালাচ্ছে তাই ওই পদধারি ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষমতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। অভ্যস্ততাই তাদের চালিত করে। যেমন ধরুন একটি অতি জনপ্রিয় মিথ্যা জিডিপি অনুযায়ী মানুষের উন্নয়ন। অসংখ্য গবেষণার পরে প্রমাণ করা গেলো জিডিপি ধরার পদ্ধতিই ভুল (যা আসলে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা)। আর সেই সাথে এও আলোচনায় আসলো আয় বাড়া মানে মান বাড়া কিনা। এতসব জোর আলোচনার পরেও রাজনৈতিক কর্মীরা এখনও একই ক্যাসেট বাজিয়েই চলছেন। অন্যদিকে ভুটান সুখ কে সূচক হিসেবে ধরছে। নিউজিল্যান্ড নদীকে মানুষের মর্যাদা দিচ্ছে ( অবশ্য নদীকে নদীর মর্যাদায় বাঁচাতে না পেরেই মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন )।
রাষ্ট্র কয়েকটি স্বার্থের কথা বলে, যেমন নিরাপত্তার স্বার্থ, তদন্তের স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ। খেয়াল করে দেখবেন এসব স্বার্থের কথা তখনই আসে যখন কোন ব্যক্তি বা পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার দরকার হয়। কোন অপরাধীর (বিশেষ করে জঙ্গি ও মাদক ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে) নাম- পরিচয় বর্ণনা দেয়া হয় না। একটা রাষ্ট্রে যখন প্রতিদিনই ঘটনা ঘটে তখন ইত্যাদি স্বার্থ বলে বলে আপাত ধামাচাপা দেয়াই সরকারের জন্য কম ঝুঁকির।
রাষ্ট্র একটা বয়ান নিয়মিত দিয়ে থাকে। ‘জনগণের সহযোগিতা চাই’। এই কথাটিতে দৃশ্যমান খারাপ কিছু নেই। কিন্তু রাস্তা পার হওয়া থেকে শুরু করে ট্যাক্স দেয়া সমস্ত ক্ষেত্রেই তা দোষারোপে পরিণত হতে দেরি হয় না। সড়ক আন্দোলনের পরে দেশের সমস্ত মিডিয়ার মহোৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল রাস্তা পার হওয়া, ওভারব্রিজে না ওঠা পথচারীদের ছবি দিয়ে। সরকার এমনিতে অবকাঠামো উন্নয়নের কথায় লাফিয়ে ওঠে কিন্তু সেটা ফ্লাইওভার জাতীয় ব্যাপারে। অন্যদিকে আপনি যদি স্কুল- কলেজ তৈরির কথা বলেন তাহলে উত্তর পাবেন রাষ্ট্রীয় কোষাগার খালি। জনগণ ট্যাক্স দিচ্ছেনা। পালটা যুক্তি হিসেবে আপনি বলতেই পারেন চুরি যাওয়া রিজার্ভ, অতিরিক্ত ব্যয়ে নির্মাণ প্রকল্প বা ১১ গুণ দামে ইভিএম কেনা। তখন আপনাকে বলা হবে অতি পরিচিত মধুর বাক্যটি ‘রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠান আলাদা’। অর্থাৎ বাস আপনার গায়ে উঠে আসলেও আপনি ক্রিমিনাল, বড় বড় ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হলে বা কর ফাঁকি দিলেও মাসে পনের হাজার টাকা আয় করা জনগণ ক্রিমিনাল।
এখন আসা যাক এতসব মিথ্যা তথ্য আমরা বিশ্বাস করি কেন? এরজন্য প্রয়োজন হয় বাকি দুই প্রবণতা। মিথ্যা তথ্য বিশ্বাস করানোর জন্য কিছু মূল বিষয়কে সমাজের সকল জবাবদিহিতা, প্রশ্ন, সন্দেহের ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠান করানো হয়। সংবিধান,পবিত্রতা, কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা ঘটনা ও জাতীয়তাবাদের মহানত্বের দোহাইয়ে সকল বড় অন্যায় ভাসিয়ে দেয়া সম্ভবপর হয়। এরপর বাকি থাকে ছোট অন্যায়গুলো। সেসব নিয়ে যেন প্রশ্ন তৈরির অবকাশই না থাকে তাই নতুন- পুরানো সকল পলিসির বিজ্ঞাপন দেয়া হয় এমন সব শব্দ দিয়ে যাতে আমাদের কাছে তা অবিসংবাদিত হয়ে ওঠে। যেমনঃ ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্বপ্নের পদ্মা সেতু। পৃথিবীর কোন দেশ ডিজিটাল হওয়াটাকে চল্লিশ বছর মেয়াদি প্রয়োজন হিসেবে ধরে নিয়েছে তার নজির নাই। ডিজিটাল হওয়া বা সেতু-ফ্লাইওভার-রাস্তা কারো স্বপ্ন হতে পারে এই গরিবিয়ানা রাষ্ট্রের মিথ্যা উৎপাদন প্রকল্প আমাদের দেখিয়েছে।
আদতে আমাদের উন্নয়নের মিথ্যা পরিসংখ্যানের চেয়ে ‘গরিব দেশ’ সংক্রান্ত মিথ্যা জনমানসে স্থায়ী প্রভাব ফেলছে। এরফলে দেশকে ‘এগিয়ে’ নিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমঘন্টার বাইরে গিয়ে প্রায় সমস্ত পেশাজীবিই দশ-তের ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছে।
রাষ্ট্র কিছু মিথ্যাকে সত্যের মত রূপ দিতে সক্ষম হয়। যেমনঃ গণতন্ত্র, জনপ্রতিনিধি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নির্বাচনকেন্দ্রিক একটি স্বকীয় সংজ্ঞা দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে এলাকার ভালো মানুষটি রাজনৈতিক সংগঠন করে না বলে বাধ্য হয়ে দলীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে পাঠিয়ে তার নাম দিয়েছি জনপ্রতিনিধি।
এত প্রক্রিয়ার কোনটিই কাজে না লাগলে সবচেয়ে শেষ ধাপ হলো অস্বীকার করা। তবে অস্বীকার করাকে আমি অন্যান্য মিথ্যার সাথে মিলিয়ে ফেলতে চাইনা। কারণ একমাত্র শেষ ধাপটিই রাষ্ট্রের আতঙ্ককে নির্দেশ করে।
এই প্রবন্ধের সাক্ষাৎকার অংশটি চালাবার সময় একজন আমাকে বলেছেন রিডাকশনিস্ট এপ্রোচ বা কোনটি বড় সমস্যা তার দিকে যেন না যাই। এই কথাটিও রাষ্ট্রের তৈরি করা মিথ্যা। আমার কাছে এই কথাটি খুবই জরুরি বলে মনে হয়েছে। আমরা সবসময়েই বড় মিথ্যা/ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি তাতে আলোচনার পরিধি কমে যায়। আশা করছি এসব ডাহা মিথ্যার আলোচনা থেকে শিক্ষার প্রয়োজন, শ্রমের প্রয়োজন, রাষ্ট্রের প্রয়োজন (অর্থাৎ এক নম্বর বা আদি মিথ্যা) নিয়ে আলাপে অগ্রসর হতে পারব।

লেখা: সামান্তা শারমিন।
প্রচ্ছদ: কুৎসিত।